শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনালে বড় মামলা নেই

অনলাইন ডেক্স:
অনেকটা অলস বসে আছেন শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনাল। উল্লেখযোগ্য কোনো মামলা চলমান নেই। শেয়ারবাজারে কারসাজিসহ জালিয়াতি, নানা অনিয়ম বন্ধ ও দুর্নীতিবাজদের দ্রুত সাজা দেওয়ার লক্ষ্যে গত বছর এই ট্রাইব্যুনাল যাত্রা শুরু করে। কিন্তু বর্তমানে এ ট্রাইব্যুনালে মামলা আছে মাত্র দুটি। প্রতি মাসে গড়ে তিন দিন করে শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ অবস্থা চলছে তিন মাস ধরে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, চলমান দুই মামলার একটির বিচার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের পথে। এটির রায় হলে মামলার অভাবে আরও অলস হয়ে পড়বে ট্রাইব্যুনাল।

গত জুনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় শেয়ারবাজারবিষয়ক স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের। চালুর পর এখন পর্যন্ত ২২টি মামলা স্থানান্তর করে আনা হয়েছে। এরই মধ্যে পাঁচ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যদিও এর মধ্যে আলোচিত কোনো মামলা নেই। রায় হওয়া পাঁচ মামলার তিনটিতে অভিযুক্তদের দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অপর দুই মামলায় অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় আসামিদের খালাস দিয়েছেন। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে। বিশেষত, নিম্ন আদালতে চিকটেক্স মামলাটি ২০ বছরে নিষ্পত্তি না হলেও তিন মাসের মধ্যে রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১৫টি আলোচিত মামলা পরিচালনায় উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ রয়েছে।

বিভিন্ন আদালতে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ৫১৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৮টি; হাইকোর্টে ২০৮টি; মেট্রোপলিটন সেশনস জজকোর্ট ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে ২৬টি; জেলা জজকোর্ট, জেলা যুগ্ম জজকোর্ট ও জেলা সহকারী জজকোর্ট ঢাকায় বিচারাধীন মামলা ১১টি; চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে বিচারাধীন ছয়টি এবং শ্রম আদালতে দুটি। এ ছাড়া জেনারেল সার্টিফিকেট কোর্টে ২৪৪টি সার্টিফিকেট মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সূত্রমতে, নিম্ন আদালতে বিচারাধীন পাঁচ শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ৩০টি ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তরযোগ্য। কিন্তু এ হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কারসাজির হোতা ও জুয়াড়িদের সাজা দেওয়া হলে আবারও মানুষের আস্থা ফিরে আসত; গতিশীল হতো শেয়ারবাজার। কিন্তু মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বড় জুয়াড়িদের সাজা হলে তারা শেয়ারবাজারে বড় ধস নামতে পারে- এমন শঙ্কায় আছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ কারণে ট্রাইব্যুনালকে কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছেন তারা। এমন অভিযোগ শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্টদের।

অবশ্য কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ১৯৯৬ কারসাজির ১২ মামলা এবং ২০০৯ ও ২০১০ সালের কারসাজির তিন মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ মামলাগুলো আগে থেকেই উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ রয়েছে। কমিশন চেষ্টা করছে মামলাগুলোর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতে। ট্রাইব্যুনালে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আসামিরা নানা অজুহাতে শুনানি পিছিয়ে ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কমিশনও চেষ্টা করছে দ্রুত শুনানির মাধ্যমে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে। আর দায়রা আদালতের বিচারাধীন তিন মামলা হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে।

গত ২০ বছরে দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাপকভাবে কারসাজি করে শত শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছে এমন অনেকের নাম ব্যবসায়ীদের মুখে মুখে শোনা যায়। ছিয়ানব্বইসহ সাম্প্রতিক কারসাজির ঘটনায় এদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। সে রকম গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার এখনও এই ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়নি।

এদিকে, আইনগত বাধায় ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করতে পারছে না বিএসইসি। এ কারণে গত বছরের শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানির শেয়ারদর কারসাজির ঘটনায় তিন হোতার বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আট মাস পরও ট্রাইব্যুনালে

মামলা করতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত বছরের ২ জুন কমিশন সভায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

সূত্র জানিয়েছে, মামলা না থাকায় হতাশ স্বয়ং ট্রাইব্যুনালের বিচারক হুমায়ূন কবীর। ট্রাইব্যুনালে মামলা হস্তান্তরের দায়িত্ব বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)। এ ক্ষেত্রে বিএসইসির গাফিলতি ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিচারক অন্য কোনো আদালতে বদলির চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বিচারক হুমায়ূন কবীরের বদলি বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।

জানতে চাইলে এসইসির মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতে ১৫টি মামলায় স্থগিতাদেশ রয়েছে। স্থগিতাদেশগুলো প্রত্যাহারের জন্য শুনানির চেষ্টা চলছে। কিন্তু হাজার হাজার মামলার ভিড়ে কমিশনের মামলাগুলোর শুনানি এগিয়ে আনা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। নিম্ন আদালতে তিনটি শেয়ার কারসাজি মামলা রয়েছে। এগুলো দ্রুত ট্রাইব্যুনালে আনা যাবে বলে তিনি জানান।

এদিকে, মামলা পরিচালনায় অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে খোদ ট্রাইব্যুনালের। বিশেষত, মামলার বিষয়ে বাদীর (বিএসইসির কর্মকর্তা) সম্যক ধারণা না থাকা, বাদী ও সাক্ষীদের সময়মতো হাজির না হওয়া এবং যথাযথভাবে সাক্ষীকে উপস্থাপন করতে না পারার অভিযোগে প্রকাশ্য আদালতে বহুবার বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেছেন বিচারক। এমনকি বিএসইসির আইনজীবী আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পর্কেও ধারণা রাখেন না বলে প্রকাশ্য আদালতে ভর্ৎসনা করেছেন বিচারক। মামলা পরিচালনায় দক্ষ আইনজীবী নিয়োগেরও অনুরোধ করেছিলেন বিচারক হুমায়ূন কবীর।

এ বিষয়ে কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, তারা কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা করছেন। অদক্ষ আইনজীবীর বিষয়ে বিএসইসির কর্মকর্তারা বলেন, আইন অনুযায়ী বিবাদীপক্ষকেই প্রমাণ করতে হয়, তারা নির্দোষ। তাই শুরুতে সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এখন অবশ্য বিচারকের অনুরোধে হাইকোর্টের চর্চা করেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদকে নিয়োজিত করা হয়েছে।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Like Box

SuperWebTricks Loading...