দেশের অর্থনীতিতে ডেসটিনির পাউলোনিয়া গাছ

আবুল কাশেমঃ সৌরজগতে পৃথিবীই একমাত্র সবুজ গ্রহ; যার কারণ মূলত গাছ, যেখানে জীবন সবুজ। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গাছের ভূমিকা অপরিসীম। হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পরিবেশকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে গাছের ভূমিকা অপরিসীম। গবেষণা অনুযায়ী যে কোনো দেশের শতকরা ২৫% ভাগ বনভূমিতে বনায়ন থাকা পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে সময়ে বাংলাদেশের বনের পরিমাণ ৯.৩ শতাংশ, আর সরকারি হিসাব মোতাবেক ১৬-১৭ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। বন অধিদফতর কর্তৃক ফরেস্ট্রি মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে ২০২০ সালের মধ্যে ২০% ভাগ ভূমিতে বন সৃজন করার মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন সূচনা করেছিলেন ‘ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেড’। ২০১০ সালে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ‘পাউলোনিয়া ট্রি’-এর উপযোগিতা পরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষামূলকভাবে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় ২ বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার পর দেখা যায় বাংলাদেশের জন্য ‘পাউলোনিয়া ট্রি’ পরিবেশবান্ধব।
পাউলোনিয়া গাছের জন্মস্থান চীন দেশে, যা আমেরিকায় সৌন্দর্যবর্ধন বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। এর পাতা বড় (১৫-৪০ সে.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে) আকৃতির। দেখতে অনেকটা হৃৎপি-ের ন্যায়। পাউলোনিয়া একটি দ্রুতবর্ধনশীল বৃক্ষ যা কিনা ৫/৭ বছরে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছটির মূল মাটির প্রায় ৮০-১০০ ফুট গভীরে প্রবেশ করে পানি শোষণ করে নিয়ে আসে। পাউলোনিয়া গাছের কার্বন শোষণ ক্ষমতা অন্যান্য গাছের চেয়ে অনেক বেশি। একটি পাউলোনিয়া গাছ বছরে ৪৮ পাউন্ড কার্বন শোষণ করে এবং ১৩ পাউন্ড অক্সিজেন পরিবেশ মুক্ত করে থাকে এবং মাটি থেকে প্রতিদিন ২৪ গ্যালন পানি বর্জ্য শোষণ করতে পারে। শীতকালে এর পাতা ঝরে মাটিতে পড়ে পচার ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের কবল হতে বাড়ি-ঘর রক্ষা করে। চীনে বর্তমানে প্রায় তের লাখ হেক্টর জমিতে পাউলোনিয়া গাছের চাষ হয়। কাঠের রং হালকা হওয়ায় সহজেই বিভিন্ন রকমের রং করা যায়। এটি পরিবেশের ভারসম্যা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি চধঁষড়হিরধপধব পরিবারের অন্তর্গত একটি বৃক্ষ। পাউলোনিয়া কাঠ ২১ শতকের একটি নতুন বিপ্লব হতে যাচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবী ব্যাপী ৫-৬ মিলিয়ন একর জমিতে পাউলোনিয়া চাষ হচ্ছে। বসন্তের শুরুতে আকর্ষণীয় ফুল আসে। নেদারল্যান্ডসের রানী অহহধ চধঁষড়হধ (১৭৯৫-১৮৬৫)-এর সম্মানে এ বৃক্ষের নাম করণ করা হয়েছে। তাই এটি প্রিন্সেস, যিনিক্স বা রয়েল এমপ্রেস বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস থেকে দেখা যায়য, জাপানে কোনো কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে বসতবাড়ির সম্মুখে একটি পাউলোনিয়া বৃক্ষ রোপণ করা হতো। ধারণা করা হতো যে, পাউলোনিয়া বৃক্ষ সৌভাগ্য বহন করে আনে এবং ঐ কন্যাসন্তান যখন বড় হবে তখন পাউলোনিয়া গাছের কাঠ দিয়ে তার বিয়ের বাক্স ও আসবাবপত্র তৈরি করা হবে। শুরু থেকে জাপানে পাউলোনিয়া বৃক্ষের ব্যাপক চাহিদা ছিল এবং এখনো আছে।
পাউলোনিয়া গাছ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, ক্ষয় রোধসহ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, এর মূল অনেক গভীরে প্রবেশ করে বিধায় সহজে হেলে পড়ে না। ঝড়-ঝঞ্ঝা হতে বাড়ি-ঘর রক্ষা করে। বাতাসে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষাসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এ গাছের পাতা বড় আকৃতির জন্য ছায়াদান বৃক্ষ এবং বহুরূপী ফুলের জন্য ড়ৎহধসবহঃধষ বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত।
পাউলোনিয়া গাছের কাঠ কয়েকগুণ বেশি শক্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও গিঁটমুক্ত। যার ফলে এই কাঠ উন্নত মানের এবং খুব চাহিদাসম্মত। এ গাছের তুলনামূলক বেশি সাদা হওয়ায় এটি পেপার গ্লাসের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ গাছের কাঠ মেহগনি, সেগুন ও একশিয়া গাছের কাঠ অপেক্ষা অধিকতর হালকা ও শক্ত। পেরেক বা স্ক্রু খুব সহজেই পোঁতা যায়। এর ফাইবার খুব সোজা ও গিঁটমুক্ত। এ কাঠ বাতাসে শুকাতে ৩০ দিন লাগে আর চিমনিযুক্ত চুলার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টায় শুকানো যায়। শীত ও গ্রীষ্মে আর্দ্রতার কম-বেশিতেও কাঠ স্থিতিশীল, সংকুচিত বা বর্ধিত হয় না। উচ্চতাপ সহনশীল, তাই সহজে আগুনে পোড়ে না। এটি দেখতে হালকা সোনালি এবং সাদা রঙের। প্রয়োজনে বিভিন্ন রঙ করা যায় এবং যে কোনো কাঠের অনুরূপ পালিশ করা যায়। এই কাঠ মসৃণ করা হলে খুব উজ্জ্বল রং ধারণ করে। মসৃণ আসবাবপত্র, গহনা বাক্স, মিউজিক্যাল যন্ত্রপাতি, দরজা, জানালা, খেলাধুলা সামগ্রীসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়। অতিদ্রুত শুকায়। পোকামাকড় বা ঘুণে ধরে না। আন্তর্জাতিক চাহিদাসম্পন্ন ও রফতানিমুখী। পাউলোনিয়া ট্রি প্রকল্প আত্মকর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এ জন্য এই গাছকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য প্রকল্প ও শিল্প গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেড ২০১১-১২ সালে পরীক্ষামূলক যে সমস্ত জায়গায় পাউলোনিয়া গাছ রোপণ করেছিল তার একটি অন্যতম জায়গা বগুড়ার শাহজাহানপুর। সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, মোহাম্মদ আলী নামে শাহজাহানপুরের ডেসটিনির একজন ডিস্ট্রিবিউটর একটি প্যাকেজ অর্থাৎ ১৫টি পাউলোনিয়ার চারা রোপণ করেছিলেন। বর্তমানে এক হাজারের ওপরে তার বাগানে পাউলোনিয়া গাছ রয়েছে এবং সমগ্র রাজশাহী বিভাগে পাউলোনিয়ার শিকড় বিক্রি করে তিনি গত ৫ বছরে প্রায় লক্ষাধিক টাকা আয় করেছেন। এই গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শিকড় থেকে জন্মায়। তাই শিকড় কার্টিং করে অতিদ্রুত প্রসার ঘটানো সম্ভব।
ডেসটিনির বগুড়া জেলার বিনিয়োগকারীদের সাথে আলাপকালে তারা এই প্রতিবেদকে জানান, যদি এই পাউলোনিয়া গাছ সমগ্র বাংলাদেশে প্রসার ঘটানো যায় তাহলে একদিকে যেমন বৃক্ষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অন্যতম ভূমিকা রাখবে। তেমনিভাবে দেশের অর্থনীতিক উন্নয়নে বিশাল অবদান রাখতে পারে এই পাউলোনিয়া গাছ। কারণ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই গাছ উন্নত দেশসমূহে রফতানি করে বিশাল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Like Box

SuperWebTricks Loading...