দান করলে সম্পদ বাড়ে

ধনবান ব্যক্তিরা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। এ জন্যই কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে তাদের যথেষ্ট ধৈর্যশীল হতে হয়। ধনসম্পদ সাধারণত মানুষকে উদ্ধত প্রকৃতি গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মগরিমায় কৃতজ্ঞ বান্দা না হয়ে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল স্বাবলম্বী ভাবায় অনুপ্রাণিত করে। কাজেই ধনবান ব্যক্তিকে দাতা হিসেবে বিনয়ী ও ধৈর্যশীল হতে হয়। দান করার পর কোনো প্রকার খোঁটা ও ক্লেশ না দিয়েও দাতা যখন দান গ্রহীতার ব্যবহারে ও কাজকর্মে উল্টো কষ্ট পায়, তখন আদম সন্তান হিসেবে ব্যথিত হয়ে রাগ হওয়া, দাতার জন্য অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। এই ধরনের পরিস্থিতি সাধারণত আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেই বেশি হয়ে থাকে, তাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ আত্মীয়স্বজনরাই এ ব্যাপারে বেশি স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। এ রকম পরিস্থিতিতে আত্মীয়তা রক্ষা করার জন্য দাতাকে ধৈর্য ধারণ করার আদেশ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, রাসূল সা:-এর প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা রা:-এর নামে মদিনায় যে মিথ্যা দুর্নাম রটনা হয়েছিল, তাতে যে ব্যক্তি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, সে ব্যক্তির পরিবার আবু বকর রা:-এর ধনসম্পত্তি বা দানখয়রাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক দিকে আল্লাহ তায়ালার হাবিব, রাসূল সা:-এর প্রিয়তমা স্ত্রী, মুসলিম উম্মতের মাতা এবং অপর দিকে নিজের মেয়ের নামে এত বড় মিথ্যা দুর্নাম রটানোর সাথে জড়িত থাকায় আবু বকর রা: ব্যথিত হৃদয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি ওই ব্যক্তিকে কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য আর দেবেন না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সেটা পছন্দ করেননি, এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না; তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [সূরা নূর : ২২]।

এরপর আবু বকর আস-সিদ্দিক রা: যত দিন বেঁচে ছিলেন, দুর্নাম রটানোতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয়ভাবে ভরণ-পোষণ করেছেন। এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রা: বলেন, এক ব্যক্তি [এসে] বলল : হে আল্লাহর রাসূল সা:, আমার কিছু আত্মীয়স্বজন রয়েছে। যাদের সাথে আমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে চলি, আর তারা সেটা ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করি, তারা আমার সাথে মন্দ ব্যবহার করে থাকে। আমি তাদের সাথে সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করি, কিন্তু তারা আমার সাথে অজ্ঞতাসুলভ আচরণ করে। রাসূল সা: বললেন : যদি তুমি এইরূপ হয়ে থাকো যেরূপ তুমি বললে, তবে তুমি যেন তাদের চোখেমুখে গরম বালু ছুড়ে মারছ। যতক্ষণ তুমি এই নীতির ওপর অবিচল থাকবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সাহায্যকারী [ফেরেশতা] তাদের মোকাবেলায় তোমাকে সাহায্য করে যেতে থাকবে। [সহিহ মুসলিম, রিয়াদুস সালেহিন, প্রথম খণ্ড ৩১৮]। স্মর্তব্য যে, দান-খয়রাত বাধ্যতামূলক নয়। নিজের ইচ্ছায় একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি জন্য যে দান করা হয় তাকে বলা হয় ‘সাদাকা’ আর জাকাত হলো আবশ্যকীয় দায়িত্ব, যা গরিবের প্রাপ্য। তাই মুসলিম উম্মতের ধনীদের জন্য জাকাত আদায় করা ফরজ দায়িত্ব। জাকাত হচ্ছে ধনীর সম্পদের ওপর গরিবের প্রাপ্য (হক), তাই এই সম্পদ ভোগ করার কোনো অধিকার তার নেই। তদুপরি জাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে নিজের সম্পত্তি আরো বৃদ্ধি করার ও পবিত্র করার একটি অন্যতম ব্যবস্থা। তাই জাকাত দান নয় বরং জাকাতের পরিমাণ সম্পদ হচ্ছে অবাঞ্ছিত সম্পদ, যা অভাবীদের জন্য ব্যয় করতে পারলে নিজ দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
সম্পদশালী হওয়াটা অনেকের জন্য ভালো নয় : অসচ্ছল অবস্থায় অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে দান-খয়রাত করে কিন্তু আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে ধনবান হওয়ার পর ধনসম্পত্তির প্রতি তার অতিশয় আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, বিধায় দান করার পরিবর্তে ধনসম্পদ আগলে রাখে। অর্থাৎ ধনসম্পদ জমা করার নেশায় পড়ে যায় এবং তাই লাভের অংশ নতুন পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করার চেষ্টা করে। তা ছাড়াও তার জীবন যাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে, বিলাসিতা বেড়ে যায়, অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ে, মানুষকে সে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। তদুপরি আবার দরিদ্র হওয়ার ভয় সৃষ্টি হয় অন্তরে, তাতে আরো উন্নতির জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে। আল্লাহ তায়ালার ‘হক্ক’ [জাকাত ও দান-খয়রাত] আদায়ে অবহেলা করে, এমনকি অনেকেই পরিশেষে ধর্মের প্রতি যে দায়িত্ব আছে সেটিও সম্পূর্ণরূপে ভুলে যান। এ ক্ষেত্রে সে একটি মহাসত্য ভুলে যায় যে, আল্লাহ তায়ালাই নিয়ামত দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করে দরিদ্র জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে মহা পরীক্ষায় ফেলেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ভুলে আল্লাহ তায়ালার নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে সে তার গচ্ছিত পুরস্কার হারিয়ে ফেলে।
আল্লাহ তায়ালার বান্দারা হালাল পথে উপার্জিত উৎকৃষ্ট বস্তু যদি একনিষ্ঠ অন্তরে তার সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, তাহলে বান্দারা পরকালে কী ধরনের পুরস্কার পাবে তার প্রতিশ্রুতি ও বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন। ‘তাদের [মুশরিকদের] সৎপথে গ্রহণের দায় তোমার [রাসূল সা:] নয়; বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন; যে ধনসম্পদ তোমরা ব্যয় কর তা তোমাদের নিজেদের জন্য; এবং তোমরা তো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভার্থেই ব্যয় করে থাক। যে ধনসম্পদ তোমরা ব্যয় কর তার পুরস্কার তোমাদের পুরোপুরিভাবে প্রদান করা হবে, তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।’ ‘যারা নিজেদের ধনৈশ্বর্য রাত্রে ও দিবসে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে তাদের পূর্ণ ফল তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।’ [সূরা বাকারাহ : ২৭২ ও ২৭৪]। উৎকৃষ্ট বস্তুর দান-খয়রাতের পুরস্কারপ্রাপ্তির এ ধরনের নিশ্চয়তা শয়তান সহ্য করতে পারে না। তাই মানবপ্রবৃত্তিতে নানা অজুহাত সৃষ্টি করে দান-খয়রাতে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যবহার করা থেকে মুসলিম উম্মতকে বিরত রাখতে শয়তান চেষ্টা করে। ফলে দাতাকে সর্বদাই নিজ প্রবৃত্তিতে উদিত ভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে অবশ্যই দৃঢ় চিত্তশীল হতে হবে এবং নিজ কল্যাণের কথা ভেবেই তাকে এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Like Box

SuperWebTricks Loading...